রিসাইকেল সিমে ঝুঁকিতে গ্রাহক

প্রতীকী ছবি

নিউজ ডেস্ক

০৩ মে ২০২৬, ০৩:১১ পিএম

মেহেরপুরের এক গণমাধ্যমকর্মী নতুন একটি নম্বর (সিম কার্ড) কেনেন। তিনমাস আগে। জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে বৈধভাবে নিবন্ধন করেন। হঠাৎ অপরিচিত ফোন। বলা হয়, নম্বরটির মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। থানায় যোগাযোগ করতে হবে। তিনি গুরুত্ব দেননি। কয়েকদিন পর আবার ফোন। এবার অর্থ দাবির চাপ। কথায় হুমকির সুর। অথচ এসবের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।


ইউটিউবে সবচে’ বেশি দেখা ১০ লাইভ

ঘটনাটি সামনে আসার পর উঠে আসে উদ্বেগজনক বাস্তবতা। মোবাইল অপারেটরদের রিসাইকেল সিম (পুনর্ব্যবহৃত) নীতির কারণে নতুন গ্রাহকরা পুরোনো ব্যবহারকারীর বোঝা বহন করছেন। এতেই তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল, আর্থিক ও আইনি ঝুঁকি।


বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো সিম টানা ১১ মাস ইনঅ্যাকটিভ থাকলে সেটিকে রিসাইকেল যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে আগে এই সময়সীমা ছিল ১৮ মাস। এরপর সেই নম্বর বাতিল করে নতুন গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয়। গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, এয়ারটেল ও টেলিটক দেশের পাঁচটি মোবাইল অপারেটরই নিয়মিতভাবে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে। তবে নম্বর পুনর্বিক্রির আগে এর সঙ্গে যুক্ত পুরোনো ডিজিটাল পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আর্থিক সেবা কিংবা অপরাধ সংশ্লিষ্ট ইতিহাস পুরোপুরি পরিষ্কার করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

রাজধানীর মিরপুরে বসবাসকারী এক চাকরিজীবী জানান, নতুন সিম নেওয়ার পরই তার নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপের ওটিপি আসতে থাকে। পরে বোঝেন, আগের ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট এখনো যুক্ত।

মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার দুই নারী জানান, অপরিচিত পুরুষরা ফোন করে ব্যক্তিগত আলাপে জড়াতে চায়। পরে জানা যায়, নম্বরগুলো আগে অন্য নারীদের ছিল।

আরও জানা গেছে, আগের ব্যবহারকারীর ঋণের কিস্তি আদায়ের ফোন এসেছে নতুন গ্রাহকের কাছে। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের তাগাদা এসেছে। এমএফএস সংক্রান্ত অভিযোগও শুনতে হয়েছে। এমনকি থানার ফোনও এসেছে।

ভুক্তভোগী রক্তিম জানান, তার বাবার ব্যবহৃত নম্বর রিসাইকেল হয়ে গেছে। কোনো নোটিশ পাননি। তিনি বলেন, এটি শুধু নম্বর নয়, স্মৃতির অংশ।

গাংনীর কৌশিক বাপ্পি বলেন, চারমাস বন্ধ থাকতেই তার সিম বিক্রি হয়ে যায়। ফেসবুক, জিমেইলসহ গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট যুক্ত ছিল। পরে সাইবার ইউনিটের সহায়তায় আংশিক সমাধান পান। কিন্তু সব সমস্যা কাটেনি।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন মোবাইল নম্বর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইমেইল, মোবাইল ব্যাংকিংসহ নানা সেবার সঙ্গে যুক্ত। আগের ব্যবহারকারী নম্বর ডিলিঙ্ক না করলে নতুন গ্রাহক পড়েন পরিচয় বিভ্রান্তি ও আইনি জটিলতায়।

মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, ডিলাররা শুধু এনআইডি যাচাই করেই সিম বিক্রি করেন। নম্বরের অতীত সম্পর্কে কোনো তথ্য বা সতর্কতা দেন না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক আফজালুর রশিদ বলেন, প্রতারক চক্র ইচ্ছাকৃতভাবে রিসাইকেল সিম ব্যবহার করে। পুরোনো নম্বর হওয়ায় মানুষ সহজে বিশ্বাস করে। এতে প্রতারণা সহজ হয়। তদন্তও জটিল হয়ে পড়ে।

দেশে অবৈধ ডিভাইস শনাক্তে এনইআইআর চালু আছে। কিন্তু নম্বরের ক্ষেত্রে নেই কেন্দ্রীয় ইতিহাস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, ডিভাইস ট্র্যাকিং সম্ভব হলে নম্বর ট্র্যাকিং কেন নয়।

রিসাইকেল নীতিমালা বাস্তবায়ন, ডিজিটাল পরিচয় ও ইতিহাস মুছে ফেলা, ভোক্তার নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা, ডিলারদের ভূমিকা, সাইবার ঝুঁকি, নীতিমালা সংস্কার এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এই সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিনিধির পক্ষ থেকে গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, এয়ারটেল ও টেলিটক কর্তৃপক্ষের কাছে ইমেইলে প্রশ্ন পাঠানো হয়।

উত্তরে গ্রামীণফোন ও রবি জানায়, তাদের সব কার্যক্রম বিটিআরসির নীতিমালা শতভাগ অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এয়ারটেল জানায়, বিষয়গুলো কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নীতির আওতাভুক্ত হওয়ায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বাংলালিংক ও টেলিটক কোনো জবাব দেয়নি।

গ্রামীণফোন কাস্টমার সার্ভিস টিমের পক্ষ থেকে শাহরিয়ার তালুকদার প্রতিবেদককে বলেন, বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১১ মাস অব্যবহৃত থাকা সিম পুনর্ব্যবহারযোগ্য। গ্রামীণফোন গ্রাহকের তথ্য ও গোপনীয়তা রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইন মেনে কাজ করে। রিসাইকেল সিমে পূর্ববর্তী গ্রাহকের এনআইডি ও তথ্য আমাদের সিস্টেম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে। ডিজিটাল ট্রেস সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে যেকোনো হয়রানি বা প্রতারণার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা নিশ্চিত করি।

এ বিষয়ে বিটিআরসির উপপরিচালক ফারহান আলম প্রতিবেদককে বলেন, রিসাইকেল সিম বিক্রির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক এবং তা লঙ্ঘিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তিনি জানান, কোনো সিম ১১ মাস নিষ্ক্রিয় থাকলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডি-অ্যাকটিভেটেড হয় এবং বিটিআরসির অনুমোদন সাপেক্ষে অপারেটররা সেটি পুনরায় বিক্রি করতে পারে।

বিটিআরসিতে দেওয়া মেইলের প্রেক্ষিতে ফারহান আলম লিখিত উত্তরে জানান, সিম পুনর্বিক্রির আগে অপারেটররা গণমাধ্যম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটে সিম নম্বরের তালিকা প্রকাশ করে। অপারেটররা গ্রাহকসংক্রান্ত তথ্য সর্বোচ্চ দুই বছর সংরক্ষণ করে এবং নির্ধারিত সময় পার হলে তা মুছে ফেলা হয়। ফলে নতুন গ্রাহকের সঙ্গে পূর্ববর্তী গ্রাহকের কোনো ডিজিটাল পরিচয় বা ব্যবহার ইতিহাস যুক্ত থাকে না। রিসাইকেল সিম ব্যবহারের কারণে কোনো অপরাধ বা ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে দায় নির্ধারণ কঠিন নয় বলেও জানান তিনি। তদন্তকারী সংস্থাগুলো সিম ব্যবহারের সময়কাল ও ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশে বর্তমানে মোবাইল নম্বর রিসাইকেলের আগে কোনো কেন্দ্রীয় নাম্বার হিস্ট্রি ক্লিয়ারেন্স সিস্টেম নেই। তবে কোনো নম্বরের সঙ্গে এমএফএস অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকলে তা যাচাই করে সিম রিসাইকেল করা হয় না।

এনইআইআর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিম ছাড়া ডিভাইস ট্র্যাকিং সম্ভব নয়, তাই মোবাইল নম্বরের জন্য আলাদা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়নি। রিসাইকেল সিম নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে গ্রাহককে প্রথমে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের কাছে জানাতে এবং সমাধান না পেলে বিটিআরসিতে অভিযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিটিআরসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, রিসাইকেল করা সিম থেকে ডিজিটাল ট্রেস স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিলিট করা কার্যত অসম্ভব। বিশ্বের অন্য কোনো দেশেও এটি পুরোপুরি করা সম্ভব কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ রয়েছে। তবে রিসাইকেল সিমের কারণে গ্রাহক কোনো ডিজিটাল বা আইনি সমস্যায় পড়লে অপারেটরদের গ্রাহককে সহযোগিতা করার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

তারা আরও জানান, সিম রিসাইকেলের আগে গ্রাহককে জানানো ও গণমাধ্যমে প্রকাশের নির্দেশনা থাকলেও বর্তমানে অপারেটররা তা যথাযথভাবে মানছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা বলেন, অপারেটর কোম্পানিগুলো সিম বিক্রির ক্ষেত্রে নানা প্রলোভনমূলক অফার দিয়ে অতিমুনাফা অর্জন করে থাকে। এসব অফারে আকৃষ্ট হয়ে অনেক গ্রাহক একসময় ২০ থেকে ২৫টি পর্যন্ত সিম কিনেছেন। অফারের মিনিট বা ইন্টারনেট শেষ হলে সিম খুলে রেখে নতুন সিম ব্যবহার শুরু করেন। এতে রিসাইকেলের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহকের সচেতনতা জরুরি। বাংলাদেশে ইনকাম ট্যাক্স, জমি রেজিস্ট্রেশন, টিআইএন সার্টিফিকেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক। এটি ভালো চর্চা নয় বলে মনে করছেন তারা। বিশ্বের অনেক দেশে সীমিত কিছু ক্ষেত্রে নম্বর বাধ্যতামূলক। সেখানে নম্বর পরিবর্তনের সহজ পদ্ধতি আছে। কিন্তু বাংলাদেশে চিত্র ভিন্ন। একবার কোনো কাগজে নম্বর যুক্ত হলে তা পরিবর্তন করা কঠিন। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও জটিল। অনেক ক্ষেত্রে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।