শহরের চকচকে বিজ্ঞাপনের নিচে ফুটপাতের নীরব সংগ্রাম

ছবি : আওয়ার বাংলাদেশ

এসএম ফারহান লাবিব (জেলা প্রতিনিধি, বগুড়া)

১২ মার্চ ২০২৬, ০২:০১ পিএম

বগুড়া শহর প্রতিদিনই ব্যস্ততায় মুখর থাকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ ছুটে চলে জীবিকার তাগিদে - কেউ অফিসে, কেউ বাজারে, কেউবা নিজের ছোট ছোট স্বপ্নের পেছনে। শহরের এই ছুটে চলা জীবনের ভিড়ে অনেক সময় কিছু দৃশ্য চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়, তবে হৃদয়ে একটি গভীর দাগ কেটে যায়। ব্যস্ত শহরের ভিড় আর কোলাহলের মাঝেই ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিল একটি মুহূর্ত - যা আজও মনে করিয়ে দেয় জীবনের নীরব সংগ্রাম আর অজানা বাস্তবতার গল্প।


আয়-ব্যয়ের হিসাব চেয়ে দলগুলোকে চিঠি দিচ্ছে ইসি

শহরের একটি ব্যস্ত সড়কের ফুটপাতে বসে আছেন এক অসহায় মা। কোলাহলের মাঝেই তিনি নিজের ছোট্ট কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, আর চোখে জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের ছায়া। কিন্তু সেই ক্লান্তির মাঝেও যেন রয়েছে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা - কারণ তিনি নিজের জন্য নন, বেঁচে আছেন তাঁর সন্তানের জন্য।


ঠিক মায়ের পাশেই ফুটপাতের কিনারায় একটি কাগজ বিছিয়ে রাখা। তার ওপর সামান্য কাপড়ের গুছি। সেই অস্থায়ী বিছানাতেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছোট্ট একটি শিশু। শহরের কোলাহলের মাঝেও শিশুটি যেন নিজের অজান্তেই ক্লান্ত শরীরটা একটু বিশ্রাম দিচ্ছে। চারদিকের কোলাহল, মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ - কিছুই যেন তাকে বিরক্ত করছে না। ক্লান্ত শরীর আর নির্ভার শৈশব তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে।

পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুদৃশ্য বিজ্ঞাপনী বোর্ড। সেখানে ঝকঝকে রঙিন মোড়কে সাজানো খাবারের হাতছানি। আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা সেখানে সুখ আর স্বাদের পসরা সাজিয়ে বসেছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ঠিক সেই বিজ্ঞাপনের গোড়াতেই, যেখানে এক চিলতে ময়লা কাগজের ওপর শুয়ে থাকা এই শিশুর শৈশব, ধুলোয় মলিন হচ্ছে। একদিকে যখন চকচকে প্যাকেটে আভিজাত্য আর বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য, ঠিক তার নিচেই এক টুকরো কাগজের বিছানায় লেখা হচ্ছে নীরব এক সংগ্রামী জীবনের গল্প।

শিশুটি হয়তো জানে না তার মাথার ওপর ঝকঝকে বিজ্ঞাপনটি তাকে কীসের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সে জানে না এই শহরের ব্যস্ততার মানে। সে শুধু জানে, তার মায়ের আঁচলের ছায়া আর এই শক্ত ইটের ওপর বিছানো কাগজটুকুই তার স্বর্গ। অন্যদিকে, মা তাঁর সমস্ত ক্লান্তি চেপে ধরে অপলক তাকিয়ে আছেন ভিড়ের দিকে- এই বুঝি কেউ আসবেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে।

একটি শিশুর ঘুম সাধারণত মায়ের কোলে, ঘরের উষ্ণ বিছানায় বা নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে হওয়ার কথা। কিন্তু এই শিশুটির ঘুম ফুটপাতে, কাগজের ওপরে। মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই, চারপাশে অচেনা মানুষের ভিড় - তবুও সেই ঘুম যেন অদ্ভুত শান্ত। চারপাশে তখন স্বাভাবিক শহুরে জীবন চলছিল। মানুষ হাঁটছে, কেউ কেনাকাটা করছে, কেউ মোটরসাইকেলে ছুটে যাচ্ছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে কয়েকজন। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেই ফুটপাতের সেই কোণায় বসে থাকা মা আর ঘুমন্ত শিশুটি যেন অন্য এক পৃথিবীর গল্প বলছিল।

মায়ের হাতে থাকা সেই জীর্ণ ব্যাগটি হয়তো তাঁর সারাদিনের সঞ্চয়। সেখানে কোনো বিলাসিতা নেই, নেই কোনো শৌখিন সামগ্রী। হয়তো সেখানে জমা আছে একমুঠো চাল কিংবা স্রেফ বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ। পথচারীদের অনেকেই হয়তো একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে চলে গেছেন। কারও চোখে হয়তো একটু মায়া জেগেছিল, কারও মনে হয়তো এক মুহূর্তের জন্য প্রশ্ন উঠেছিল। তবে ব্যস্ত শহরের জীবন খুব বেশি সময় কাউকে থামতে দেয় না। এই মা আর শিশুর পৃথিবীটা বড্ড ছোট। তাদের কোনো বড় ‘আকাঙ্ক্ষা’ নেই, নেই কোনো আকাশছোঁয়া উচ্চাশা। তাদের কাছে এক চিলতে ছায়া আর সন্তানের এই শান্ত ঘুমটুকুই পরম পাওয়া।

সময় পেরিয়ে গেছে। সেই ছবির মুহূর্ত এখন অতীত। আজ সেই মা কোথায় আছেন, শিশুটি কেমন আছে - তা হয়তো কেউ জানে না। হয়তো তারা অন্য কোনো শহরের ফুটপাতে, হয়তো কোনো অজানা গ্রামের পথে, আবার হয়তো জীবনের নতুন কোনো আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু সেই মুহূর্তটি ক্যামেরায় বন্দি হয়ে আছে - নীরবে, নিঃশব্দে। যেন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিতে চায়, এই সমাজে এখনও অনেক অজানা গল্প আছে। অনেক না-বলা কষ্ট আছে, অনেক নীরব সংগ্রাম আছে।