সিগন্যাল ভাঙলেই ডিজিটাল মামলা
তিন দিনে এআই ক্যামেরায় ধরা পড়ল আড়াই হাজার ঘটনা

ছবি : সংগৃহীত
১২ মে ২০২৬, ০৮:২২ পিএম
রাজধানীর সড়কে ট্রাফিক আইন ভাঙলেই এখন পার পাওয়ার সুযোগ কমছে। মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও চালকদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা। সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলা কিংবা হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর মতো অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে রাখা হচ্ছে ফুটেজ। পরে যাচাই শেষে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল মামলা।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সই করেছেন রাষ্ট্রপতি
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এ প্রযুক্তি চালুর পর প্রথম তিনদিনেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক থেকে আড়াই হাজারের বেশি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ) সেগুলো যাচাই–বাছাই করছে। যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছে মামলা ও নোটিশ পাঠানো হবে।
ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বর্তমান কমিশনার মো. সরওয়ার প্রায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো এবং চালকদের নিয়ম মানতে উদ্বুদ্ধ করাই এখন তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার।
ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এআই–চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, কাকরাইল, বিজয় সরণি, রামপুরা, গাবতলী ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণির মতো ব্যস্ত এলাকা।
এই ক্যামেরাগুলো লালবাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, জেব্রা ক্রসিং দখল, উল্টো পথে চলাচল, সিটবেল্ট না পরা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধ শনাক্ত করছে।
কারওয়ান বাজার মোড়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, সিগন্যাল পরিবর্তনের সময় অনেক চালক আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হচ্ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। দায়িত্বরত এক ট্রাফিক ইন্সপেক্টর বলেন, আগে আইন ভাঙা গাড়ি থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সড়কে জটলা তৈরি হতো। এখন ক্যামেরায় ফুটেজ ধারণ হওয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বেশি মনোযোগ দেওয়া যাচ্ছে।
একই কথা জানান ট্রাফিক সার্জেন্টরাও। তাঁদের ভাষ্য, আগে কাগজে মামলা দিতে গিয়ে সময় লাগত, অনেক সময় যানজটও বাড়ত। এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিক মামলা দেওয়া সহজ হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। বাংলামোটরে অপেক্ষমাণ আব্দুর রাজ্জাক নামে এক যাত্রী বলেন, আগে অনেক চালক সিগন্যাল না মেনে দ্রুত চলে যেতেন। এখন তুলনামূলকভাবে গাড়ি ধীরে চলছে এবং রাস্তা পার হওয়াও কিছুটা নিরাপদ মনে হচ্ছে।
প্রাইভেটকার চালক রহিম শেখ বলেন, কোথায় কখন ক্যামেরা ফুটেজ ধারণ করছে, তা বোঝা যাচ্ছে না। ফলে চালকেরা বাধ্য হয়েই নিয়ম মেনে চলছেন।
ডিএমপির কর্মকর্তারা জানান, ক্যামেরাগুলোতে ‘রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট-২০১৮ ভায়োলেশন ডিটেকশন সফটওয়্যার’ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফুটেজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট মালিক বা চালকের মোবাইলে এসএমএস এবং ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হবে।
তবে শুরুতেই কিছু সীমাবদ্ধতার মুখেও পড়েছে কর্তৃপক্ষ। অনেক যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত থাকায় সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে। এ কারণে শিগগিরই নম্বরপ্লেট স্পষ্ট রাখার বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ডিএমপি।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান বলেন, নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা বুঝতে কিছুটা সময় লাগবে। ইতিমধ্যে সংগ্রহ করা ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চালক ও মালিকদের কাছে নোটিশ পাঠানো শুরু হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে টিটিইউতে সাতজন সদস্য কাজ করছেন। ভবিষ্যতে জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।
এদিকে সরকারপ্রধানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন ডিএমপি কমিশনার। শুধু জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সচেতনতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা কীভাবে আরও কার্যকর, আধুনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা যায়—সেটিই এখন ডিএমপির ভাবনা ও কাজের কেন্দ্রবিন্দু।


